চয়ন রায়ঃ কলকাতাঃ পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা মুখ্যসচিব হলেন নন্দিনী চক্রবর্তী। বুধবার সন্ধ্যায় নবান্ন থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। বিদায়ী মুখ্যসচিব মনোজ পন্থকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব পদে নিয়োগ করা হয়েছে। নন্দিনী এতদিন স্বরাষ্ট্র, পাহাড় ও পর্যটন দফতরের সচিব পদে কর্মরত ছিলেন। জগদীশ প্রসাদ মিনাকে দেওয়া হয়েছে নন্দিনীর স্বরাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব। ১৯৯৪ সালের আইএএস আধিকারিক নন্দিনী। তাঁর অবসর ২০২৯ সালের জুন মাসের শেষদিকে। অর্থাৎ, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত নন্দিনীই রাজ্যের মুখ্যসচিব থাকবেন। ১ জানুয়ারি থেকে রাজ্যের নতুন স্বরাষ্ট্রসচিব হবেন জগদীশ।

প্রসঙ্গত, গত ৩০ জুন মুখ্যসচিব পদে পন্থের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তখন নবান্নের আবেদনের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার মুখ্যসচিবের মেয়াদ আরও ছ’মাস বাড়িয়ে দেয়। সেই মেয়াদকাল শেষ হল বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর। তাই নতুন বছর শুরুর আগেই রাজ্যের নতুন মুখ্যসচিব নিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছিল। সেইমতো বুধবার রাতেই প্রশাসনিক ও কর্মী বিনিয়োগ দফতর বিজ্ঞপ্তি জারি করে নতুন মুখ্যসচিবের নিয়োগের কথা জানিয়ে দিল। প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর নন্দিনীকে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব করা হয়েছিল। সেই অর্থে দেখতে গেলে নন্দিনী ছিলেন রাজ্যের দ্বিতীয় মহিলা স্বরাষ্ট্রসচিব। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন লীনা চক্রবর্তী। তিনি বাম আমলে ওই পদে গিয়েছিলেন।

স্বরাষ্ট্রসচিব হিসেবে নন্দিনীর নিযুক্তি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ওই নিয়োগকে ‘সম্পূর্ণ অবৈধ’ বলে দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একাধিক বরিষ্ঠ আধিকারিক তথা অতিরিক্ত মুখ্যসচিব এবং প্রধান সচিবদের ডিঙিয়ে নন্দিনীকে স্বরাষ্ট্রসচিব পদে নিয়োগ করা হয়েছে। যা সরকারি নিয়মের পরিপন্থী। যদিও এই মর্মে কোনও ‘আইন’ নেই। পুরোটাই ‘রাীতি এবং রেওয়াজ’। ঘটনাচক্রে, নন্দিনীকে মুখ্যসচিবও করা হল সেই একই ধারায়। অর্থাৎ, একাধিক অফিসারকে ডিঙিয়ে (প্রশাসনিক পরিভাষায় ‘ ‘সুপারসিড’ করে)।
Sponsored Ads
Display Your Ads Here
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনেকেই ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখা হয়েছে বলে মনে করছেন। ঘটনাপ্রবাহ বলছে, মনোজের পরে স্বরাষ্ট্রসচিব পদে অন্তত তিনটি নাম নিয়ে নবান্নে জোরাল জল্পনা ছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে নন্দিনী ছিলেন না। যদিও নন্দিনীর নাম যে একেবারেই আলোচনায় আসেনি, তা-ও নয়। বিশেষত, তিনি মুখ্যমন্ত্রী ‘আস্থাভাজন’ বলে পরিচিত হওয়ায়। তবে নন্দিনীকে স্বরাষ্ট্রসচিব হিসাবে নিয়োগ করে মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনের অন্দরে একাধিক ‘বার্তা’ দিয়েছেন। প্রথমত, নন্দিনী মহিলা এবং বাঙালি। আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে নন্দিনীই বাঙালি মুখ্যসচিব হলেন।

দ্বিতীয়ত, বিদায়ী মুখ্যসচিব মনোজকে মমতা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেই রাখলেন। প্রশাসনের একটি অংশের মতে, মনোজের উত্তরণই হল। মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব হিসাবে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেই থাকবেন। যেমন আগেও ছিলেন। পাশাপাশিই, মুখ্যমন্ত্রীর বর্তমান প্রধান সচিব গৌতম সান্যাল অসুস্থতায় ভুগছেন। ফলে তাঁর উপর কাজের ভারও বেশ খানিকটা কমালেন মমতা। একইসঙ্গে গৌতম অবসর নিলে ওই পদে কে যাবেন, তারও বন্দোবস্ত করে রাখলেন।
Sponsored Ads
Display Your Ads Here
স্বরাষ্ট্রসচিব পদে জগদীশের নিয়োগও নবান্নের আধিকারিকদের একাংশের মধ্যে খানিকটা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। কারণ, প্রথমত জগদীশ রাজ্য প্রশাসনের ইতিহাসে ‘জুনিয়র মোস্ট’ স্বরাষ্ট্রসচিব। তিনি সরাসরি ‘সচিব’ থেকে ‘স্বরাষ্ট্রসচিব’ হয়েছেন। রেওয়াজ অনুযায়ী ওই পদে অতিরিক্ত মুখ্যসচিব পদমর্যাদার কাউকে নিয়োগ করা হয়। এর আগে একবারই তার ব্যতিক্রম ঘটেছিল। যখন প্রধান সচিব (প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি) পদ থেকে স্বরাষ্ট্রসচিব হয়েছিলেন অত্রি ভট্টাচার্য। প্রশাসনের একাংশের দাবি, জুনিয়র হওয়ায় জগদীশের মুখ্যসচিব তথা প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব নন্দিনীর থেকে সময়ে সময়ে পরামর্শ নিতেও কোনও সমস্যা হবে না। আবার একই ভাবে মনোজকেও মমতা নন্দিনীর তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখলেন। ফলে প্রশাসনের একেবারে উপরিভাগে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রইল।
ঘটনাচক্রে, প্রশাসনিক আধিকারিক হিসাবে নন্দিনীর কেরিয়ারে নানা ওঠাপড়া হয়েছে। ২০১১ সালে মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে তথ্যসংস্কৃতি সচিব হিসাবে প্রশাসনিক মহলে মুখ্যমন্ত্রীর ‘আস্থাভাজন’ হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কোনও প্রশাসনিক দায়িত্ব পাননি। ২০২২ সালের নভেম্বরে সিভি আনন্দ বোস পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের দায়িত্বে এলে নন্দিনীকে রাজ্যপালের প্রধান সচিব হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে রাজ্যপালের আপত্তির কারণে তাঁকে সরিয়ে পাঠানো হয় পর্যটন দফতরের দায়িত্বে। তার পরে নন্দিনীকে ‘স্পর্শকাতর’ পাহাড়ের দায়িত্বও দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। শেষপর্যন্ত ২০২৩ সালের শেষে তাঁকে স্বরাষ্ট্রসচিব পদে নিয়োগ করেন মমতা। তখনও সেই সিদ্ধান্ত প্রশাসনের অন্দরে আলোচিত হয়েছিল।
Sponsored Ads
Display Your Ads Hereঘটনাচক্রে, এ বারেও সেই ৩১ ডিসেম্বরেই নন্দিনীকে মুখ্যসচিব করলেন মমতা। এ বারেও আলোচনা জারি আছে। মুখ্যসচিব-স্বরাষ্ট্রসচিব ছাড়াও আরও একঝাঁক রদবদল হয়েছে নবান্নে। নন্দিনী মুখ্যসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার বরুণ রায়কে দেওয়া হয়েছে পর্যটন দফতরের সচিবের দায়িত্ব। দুষ্মন্ত নারিয়ালাকে অতিরিক্তি দায়িত্ব হিসাবে কারা দফতরের সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য ও কারিগরি দফতরের সচিব সুরিন্দর গুপ্তাকে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের ডিভিশনাল কমিশনার করা হয়েছে। সুন্দরবন উন্নয়ন দফতরের সচিব অত্রি ভট্টাচার্যকে নেতাজি সুভাষ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রেনিং ইন্সিটিটিউটের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।









