অনুপ চট্টোপাধ্যায়ঃ কলকাতাঃ দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কেটে গিয়েছে ৭৯ বছর। এর মধ্যেই অনেকটাই বদলে গিয়েছে দেশের চেহারা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয়েছে ঝাঁ চকচকে শহর। উন্নত দুনিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন কলকারখানা, অত্যাধুনিক বিমানবন্দর। মাটির তলা দিয়ে ছুটছে মেট্রো রেল। বুলেট ট্রেন চালানোরও তোড়জোড় চলছে। চাঁদে পাড়ি দিয়েছে ভারতীয় মহাকাশযান। সারা দেশ যখন সামনের দিকে এগোচ্ছে, গোঘাটের দ্বীপ এলাকা বলে পরিচিত নকুণ্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতের দেওয়ানচক গ্রামের মানুষরা রয়ে গিয়েছেন সেই তিমিরেই!
বেহাল রাস্তাঘাট। ঠিকমতো মেলে না পানীয় জল। রাস্তায় জ্বলে না আলো। চারিদিকে ঝোপঝাড়। সাপের আতঙ্কে ভয়ে ভয়ে দিন কাটে মানুষের। স্কুলে যেতেও পিছপা হয় গ্রামের ছেলে–মেয়েরা। মাটির দেওয়াল আর ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া এক চিলতে ঘরে কোনও রকমে জীবন কাটান এই গ্রামের মানুষরা। বলতে গেলে প্রতি বছরই বর্ষা এলেই জলে ডুবে যায় গ্রাম। ভেসে যায় ঘরবাড়ি। নষ্ট হয় খেতের ফসল। ভোটের সময় নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান ঠিকই, কিন্তু তাঁদের ভাগ্যের দিনলিপির কোনও বদল হয় না।
গ্রামের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, আবাস যোজনা প্রকল্পে সরকার গরিবদের পাকা বাড়ি তৈরি করে দিলেও এখানকার বাসিন্দারা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বর্ষার সময় মাসের পর মাস জমি জলে ডুবে থাকে। তাই এখানে চাষাবাদ তেমন হয় না। এখানে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের বেশিরভাগই অনের জমিতে দিনমজুরির কাজ করেন। নির্জন এলাকা হওয়ায় এক সময় পুলিশের নজর এ়ডাতে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই দেওয়ানচক গ্রামে গা ঢাকা দিতেন। এখানকার মানুষরাই তাঁদের আত্মগোপনের সুযোগ করে দিতেন। তবু সমস্ত সুখভোগ থেকে বঞ্চিত এই গ্রামটি।
Sponsored Ads
Display Your Ads Hereদেওয়ানচক গ্রামের বাসিন্দা অসীমা পোদ্দার বলেন, আমি মিড–ডে মিল রান্না করি। এখানে রাস্তাঘাটে এত বিষাক্ত সাপ ঘুরে বেড়ায়, আমি নিজেও সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি। চিন্তা হয় ছেলে–মেয়েগুলোর জন্যও।’ স্থানীয় বাসিন্দা পম্পা সর্দার, প্রতিমা দিগার, সোমা দিগার, সাবিত্রি দিগার, মনসা সর্দারের গলাতেও হতাশার সুর। মনসা সর্দার বলেন, ‘আমাদের এখানে কোনও চাষবাস হয় না। কাজের কোনও সুযোগ নেই। ১০০ দিনের কাজও হয় না। অনেকে ভালো করে দু’বেলা খেতে পায় না। সরকারও কোনও দিন আআমাদের দিকে মুখ ফিরে তাকায়নি। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। বাকিরা কোনও মতে দিন গুজরান করছেন।’
গ্রামের একটি স্কুলের শিক্ষক স্বপন ঘোষাল বলেন, ‘নতুন সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ, পারলে গ্রামটার দিকে একটু তাকান। সত্যি বলতে কী দেশ স্বাধীন হলেও এই গ্রামের বাসিন্দারা আজও পরাধীন।’
Sponsored Ads
Display Your Ads Hereগোঘাটের প্রাক্তন বিধায়ক বিশ্বনাথ কারকের বাড়ি দীপাঞ্চল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। প্রার্থী হিসাবেও বহুবার তিনি সেখানে ভোটের প্রচার করতে গিয়েছেন। তাই এই এলাকা সম্পর্কে তিনি বিশেষ ভাবে অবহিত। যদিও তিনি সেখানকার অনুন্নয়ন ও বঞ্চনার অভিযোগের দায় নিতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘বিধায়ক থাকাকালীন আমি ওই এলাকার উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তৃণমূল আমাকে কাজ করতে দেয়নি।’
গোঘাটের বর্তমান বিজেপি বিধায়ক প্রশান্ত দিগার অবশ্য জানিয়েছেন, ওই গ্রামের ভোল পাল্টানোর জন্য তিনি খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। যাঁদের বাড়িঘর নেই, তাঁদেরকে আবাস যোজনা প্রকল্পে পাকা বাড়ি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘এতদিন এই গ্রাম অন্ধকারে পড়েছিল। আমি কথা দিচ্ছি, ওখানেও উন্নয়ন হবে। তার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ করা হবে। শুধু আমাকে একটু সময় দিন। সব সমস্যার সমাধান করব।’









